ডিজিটাল বার্তা ডেস্ক: একে একে বেরিয়ে আসছে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর। এর মধ্যেই বিভাগটির ভেতরে চলছে বৈষম্যের অস্থিরতা। ঠিক এমন সময়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের দায়িত্বে আসেন শীষ হায়দার চৌধুরী। দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত এই বিভাগকে কীভাবে সামলে নেবেন, এগিয়ে নেবেন সঠিক লক্ষ্যে-এসব নিয়েই মুখোমুখি তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী। সাক্ষাতকার নিয়েছেন আল-আমীন দেওয়ান।
সচিব হিসেবে শীষ হায়দার চৌধুরী তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগে যোগ দেন ১৫ সেপ্টেম্বর। শীষ হায়দার চৌধুরী পেশাগতভাবে একজন পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিশেষজ্ঞ এবং একজন ন্যাশনাল প্রকিউরমেন্ট প্রশিক্ষক। এছাড়াও তিনি পাবলিক ফিনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট এবং প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের প্রশিক্ষক। পাবলিক ফিনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট, এইড ম্যানেজমেন্ট এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্টের ক্ষেত্রে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পিয়ার রিভিউড জার্নালে তাঁর প্রকাশনাও রয়েছেন। তিনি ৩১ বছর ধরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ অনুষদ সদস্য হিসেবে শিক্ষকতা করছেন।
প্রশ্ন-১ : পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও চ্যালেঞ্জিং এক সময়ে আপনাকে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের দায়িত্ব দেয়া হলো, এই বিভাগকে আপনি কোন অবস্থায় পেলেন ?
শীষ হায়দার চৌধুরী : আপনি ঠিকই বলেছেন, এই সময়ে এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব এবং কনফিডেন্সের ব্যাপার। ১৫ বছরে আমাদের যে সময়টা পার করেছি আমরা কিন্তু এগিয়েছি, আমরা ইন্ডাস্ট্রি ৪.০ টাচ করেছি। কিন্তু এটা টাচ করতে গিয়ে আমাদের যে অবস্থান সৃষ্টি হয়েছে এটা সত্যিকারে যা আমরা ভিজিবিলি দেখতে পাচ্ছি তা নাকি অন্যকিছু-এটাই এখন স্টক টেক করার ব্যাপার।এখন বিষয়গুলো ডিগ করছি, কী হয়েছে এবং আমরা কীভাবে এগুতে পারি। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টার স্পষ্ট নির্দেশনা, লুক ফরওয়ার্ড, ডোন্ট লুক ব্যাক, ডোন্ট ক্যারি অ্যানি লিগ্যাসি। যে অনুযায়ী আমরা চেষ্টা করছি এখানে যে দপ্তর-সংস্থাগুলো আছে, চলমান ২১টি প্রকল্পগুলো কী অবস্থায় আছে এবং এই অবস্থা হতে উত্তরণ হয়ে আমরা কীভাবে এগুতে পারি।এখানে বিপুল পরিমাণ বাজেট সরকার সবসময় সংস্থান করতো, এই বাজেটের সদব্যবহার যদি দেখতে হয় তাহলে পুরো প্রকিউরমেন্ট সিস্টেমকে অ্যানালাইসিস করতে হবে। আমি চেষ্টা করছি এটা ডিগ আউট করতে। পাবলিক প্রকিউরমেন্টটা রুল এবং অ্যাক্ট মেনে করতে হয় অ্যাকজ্যাক্টলি এটাকে কমপ্লাই করা হয়েছে কিনা, আর যদি হয়েও থাকে এখানে সর্ষের মধ্যে ভূত ছিল কিনা-এই জিনিসগুলো আমরা খুঁড়ে বের করার চেষ্টা করছি। আমরা অনেকদূর এগিয়েওছি।
প্রশ্ন-২ : আপনি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুল ও অ্যাক্ট মেনে চলার কথা বললেন, অথচ আমরা দেখেছি ক্লাউড অ্যাপ্লিকেশন এবং প্লাটফর্ম ওরাকলকে একই সার্ভিসের যোগ্য প্রতিযোগী থাকার পরও তাদের সরাসরি কাজ দেয়া হয়েছে। এমন আরও ঘটনা নিশ্চয়ই ইতোমধ্যে খুঁজে পেয়েছেন ?
শীষ হায়দার চৌধুরী : ধরা যাক, ওপেন কম্পিটিশনের একটা সুযোগ আছে। এরমানে হলো আমি প্রত্যেককে অ্যালাউ করবো টেন্ডারিং প্রসেসে পার্টিসিপেট করার। এটা না করে আমি যদি টার্গেটেড কিছু পিপলকে এই কাজটা করার জন্য ইনভাইট করি ইউজিং অ্যানাদার মেথড, ডাইরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড-তাহলে এটা সুস্পষ্ট ব্যতয়। যখন যোগ্য অনেক প্রতিযোগী থাকবে, এ নাম্বার অব প্রতিযোগী থাকবে ওই জায়গায় যদি একজনকে টার্গেট করে কাজ অফার করি তখন ওটা অনিয়ম, এটা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুল এবং অ্যাক্টের ব্যতয় করা হলো। এই জিনিসগুলো আমরা হাইলাইট করছি।
প্রশ্ন-৩: বাংলাদেশে ১৬০০ কোটি টাকা খরচ করে নিজস্ব ডেটা সেন্টার করার পর দেশের সরকারি ডেটা-নথিসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভান্ডার ওরাকলকে দিয়ে দেশের বাইরে চলে গেল, এটা কীভাবে হলো ? এদিকে সরকার এখন একই কাজের জন্য ওরাকলকে দুই জায়গায় ডাবল বিল দিচ্ছে ! আবার অর্থ সাশ্রয়ের সুযোগ বা বিকল্প থাকার পরও সেবা নিয়ে বেশি অর্থ খরচ করছে !
শীষ হায়দার চৌধুরী : ডেটার একটা অন্যতম প্রধান বিষয় হলো ডেটার সিকিউরিটি। এটা যদি আমাদের হাতে না থাকে, এটা যদি অন্য হাতে অন্য এনটিটিজের কাছে থাকে, তাহলে আমি কিন্তু ঝুঁকিতে। আমরা বিশ্বব্যাপী দেখছি, হ্যাকিং হচ্ছে। সেন্ট্রাল ব্যাংকের মতো জায়গার ইনফরমেশনও কিন্তু হ্যাকিং হয়ে যাচ্ছে। এখন যদি এইরকম আমি ডেটা অন্যের হাতে দিয়ে দেই তাহলে বিষয়টা, পাঞ্জাবির পকেটে মানিব্যাগ রেখে নীলক্ষেতে ঘোরাঘুরি করছেন। যার মানে মানিব্যাগটা পকেটমারের হাতেই দিয়ে দিলেন।ওরাকল যে কাজটি করেছে, এখন আমরা এসব ডেটা-নথি খুব দ্রুততার সাথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি, এটা চলমান আছে।আসলে নিজেদের রিসোর্স যদি থাকে আর তা যদি ইউটিলাইজ না করি তাহলে একদিকে ইন্সটলেশন ও এস্টাবলিশমেন্টের একটা খরচ এখানে আছে আবার আরেকটা খরচ বাইরে আছে। সো, আমরা কেন ডুপ্লিকেশনের দিকে যাবো ! এটা একটা বড় জায়গা, এটা আমাদের নজরদারিতে এসেছে। এখন এটাকে অ্যাড্রেস করে কীভাবে দ্রুততার সাথে বেস্ট ইউটিলাইজ করতে পারি সেটা দেখা হচ্ছে।আর আমাদের ন্যাশনাল ডেটা সেন্টার বা এনডিসির (বিসিসিতে যেটা আছে) সঙ্গে হাইটেক পার্কের ডেটা সেন্টার কোম্পানির ( যারা ওরাকলে ডেটা রেখেছে) খরচের বড় একটা পার্থক্য আছে । আমরা এটাও খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি কেন ওখানে এই বাড়তি খরচ। ধরেন আমি এখানে যেটা পাই ৫ টাকায় সেখানে ওখানে আমি কেন ২০ টাকায় রাখতে যাবো ! এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন এজেন্সি তার ক্লাইন্ট সুতরাং খরচটা তো শেষ পর্যন্ত সরকারেরই যাচ্ছে। তাই এই জিনিসগুলো আমরা যাতে ক্লোজ করে নিয়ে আসতে পারি, সেদিকেও আমরা নজরদরি দিয়েছি।
প্রশ্ন-৪ : একই ধরনের প্রকল্প বারবার নেয়া হচ্ছে। একই কাজের জন্য ভিন্ন ভিন্ন প্রকল্প করার মানে কী ?
শীষ হায়দার চৌধুরী : এটা গুরুত্ব প্রসঙ্গ। ডুপ্লিকেশন, ট্রিপলিকেশন হয়েছে। একটা কাজ হয়তো হয়ে গেছে আবার এই কাজটি করা। প্রজেক্ট শেষ হওয়ার পর মেইন্টেন্যান্স ও অপারেশনের একটা কাজ থাকে, সেটা হতে পারে। কিন্তু অ্যালাইনমেন্টের খুব অভাব ছিল। অর্থাৎ একটা কাজ যদি ১০ টাকা ব্যয় করে হয়ে যায়, একই কাজ এসেনসিয়ালি ফর দ্যা ক্যাপিটাল ফ্লাইট, টাকাগুলোকে ভিন্ন হাতে এবং ভিন্ন খাতে দেয়ার জন্যই হয়তো কাজগুলো করা হয়েছে।আমরা কাদেরকে কাজ দিচ্ছি, কোন লোকগুলোকে কাজ দিচ্ছি ! আবারও বলছি, ট্যাক্স পেয়ারস মানি, ডেভলমেন্ট পার্টনার্স এইড-কিন্তু অ্যালাইনমেন্টটা হলো না। এখন এক টাকার কাজ আপনি তিনবার করলেন, বারবার করলেন-এর তো কোনো মানে হয় না।এরবাইরেও আরও কথা আছে, আপনি একটি প্রকল্পে ৫ টাকায় একটি কাজ করতে পারতেন সেটি ওই প্রকল্পেই ২০ টাকায় করেছেন অথবা কাজ হয়নি।
প্রশ্ন-৫ : বিভাগটিতে আমরা প্রকিউরমেন্টই যদি দেখি সেখানে কিন্তু মনোপলির অভিযোগ রয়েছে। যেমন গুরুত্বপূর্ণ এবং বড় প্রকল্প ইনফো সরকার, হাইটেক পার্কের কথা উল্লেখ করা যায়। এই মনোপলি আপনার সুশাসন এবং প্রকল্পগুলোর লক্ষ্য অর্জনে বাধা নয় কী ?
শীষ হায়দার চৌধুরী : ইনফো সরকারের তিনটি ফেইজেই অনিয়ম হয়েছে বলে তথ্য আছে। এগুলো আমরা আইডেন্টিফাই করার চেষ্টা করছি। এগুলোর জন্য সরকারের যেসব দপ্তর ও সংস্থা আছে তাদের রিপোর্টগুলো আমরা দেখছি। একইসাথে আমরা টিম করে দিয়েছি, যে টিমগুলো আইডেন্টিফাই করবে ব্যতয়-বিচ্যুতিগুলো কোথায়।ইনফো সরকার প্রকল্পে বিটিসিএল ছাড়াও ফাইবার এট হোম ও সামিট কমিউনিকেশন্স কাজ করেছে।এ দুটি প্রতিষ্ঠান (ফাইবার এট হোম ও সামিট কমিউনিকেশন্স) কাজ পেল কীভাবে, তারা কাজ কতটুকু করলো, সে কাজটি তার কাজ কিনা নাকি সে অন্য কাজের জন্য যোগ্য অথচ তাকে এই কাজ দেয়া হয়েছে। এ দুটি প্রতিষ্ঠান সার্ভিস নেটওয়ার্কিংয়ের কাজ করে নাকি বিল্ডিংয়ের কাজ করে, কন্সট্রাকশনের কাজগুলো করে-এগুলো আমরা দেখছি। বেশ কিছু জিনিস আমার হাতে এসেছে, এগুলো এখনও বলার সময় আসেনি, কনক্লুশন রিমার্কস দেয়ার সময় আসেনি, হয়তো সামনের দিকে পাবো।তবে অনিয়ম যে হয়েছে এট নিশ্চিত করেই বলা যায়।
প্রশ্ন-৬: অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা প্রকল্পগুলো নিয়ে এখন করছেন ?
শীষ হায়দার চৌধুরী : এই প্রকল্পগুলোতে বাংলাদশের ট্যাক্স পেয়ার্স মানি যেগুলো, গরীব জনগোষ্ঠীর কাছ হতে নেয়া ট্যাক্স সে টাকা। এখানে ডেভলপমেন্ট পার্টনারের কাছ থেকে নেয়া টাকাও যদি হয়, এই টাকাতো সুদসহ ফেরত দিতে হবে।এই যে ব্যাপকভাবে জনগণের টাকা এখানে অ্যালোকেট করা হয়েছে, যে আমরা বহু আগেই ইনফরমেশন সুপার হাইওয়েতে উঠে গেছি সেখানে যেন এই চলাটা মসৃণ হয়। কিন্তু এই কাজ করতে যেয়ে সেখানে যদি ক্যাপিটাল ফ্লাইট হয়, ব্যতয়-বিচ্যুতি ঘটে, চৌর্যবৃত্তির ঘটনাগুলো ঘটে, করাপশনের বড়সড় এরিয়া হিসেবে আইডেন্টিফাইড হয় তাহলে আমরা তো এগুতে পারবো না। সেজন্য অনেকগুলো কাজকে থামিয়ে দেয়া হয়েছে আর যেগুলো না হলে নয় সেগুলো চলমান আছে।যেমন সফটওয়্যার কোয়ালিটি টেস্টিং সেন্টারের যদি এই টেস্টিং করার মানসম্মত সক্ষমতা না থাকে তাহলে এ ধরেনের প্রজেক্ট আমি কেনো নেবো ? যেখানে এটা প্রাইভেট সেক্টর হতে একই খরচে বা কম খরচে করে নেয়া যায়। আমার আসলে লোকজন নিয়োগ করে খরচ করে এই কাজগুলোর করার দরকার নেই। আইডিয়া প্রকল্প এখন প্রায় ক্লোজ প্রজেক্ট এবং প্রকল্পে আমরা চেষ্টা করছি সরকারের অন্যকিছু এনটিটি আছে এগুলোর সঙ্গে ট্যাগ করে দেয়ার। আলাদাভাবে এই প্রকল্পকে চলমান না রেখে যদি সময়ও থাকে তারপরও অন্য যে একটিভিটি আছে সেগুলোর সঙ্গে ট্যাগ করে দেয়া।
প্রশ্ন-৭ : পরিবর্তিত পরিস্থিতির পর আপনার দপ্তরে বৈষম্যে নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভের প্রকাশ দেখেছি। বিভাগের অভ্যন্তরে এক ধরনের অস্থিরতা চলছে। উদ্ভুত পরিস্থিতি কীভাবে সামলাবেন ?
শীষ হায়দার চৌধুরী : যারা বঞ্চিত হয়েছেন বলে দাবি করছেন তারা আনুষ্ঠানিকভাবে আমার সঙ্গে দেখা করেছে। তারা অসম্ভব সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছে, তারা তাদের দাবিগুলো জানিয়েছে। আমি তাদের জানিয়েছি বঞ্চনার শিকার সারাদেশে হয়েছে, সব দপ্তরে সব জায়গায়, যেখানে একদল লোককে বেনিফিট দেয়া হয়েছে আরেকদল লোককে ডিপ্রাইভ করার বিনিময়ে। আমি আমার দপ্তরে সবাইকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, আমি প্রকৃত জিনিসটা অ্যানালাইসিস করবো এবং প্রকৃতই যারা বঞ্চনার শিকার হয়েছে তারা তাদের হারানো অধিকারকে আবশ্যিকভাবে ফিরে পাবেন।
প্রশ্ন-৮ : দেশের ফ্রিল্যান্সারদের সত্যিকারের প্রতিষ্ঠানিক একটি পরিচয় দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথপ্রযুক্তি উপদেষ্টা। এটি সত্যিই কী বাস্তবায়ন হবে না অন্য সময়ের মতো বলার জন্য বলা ?
শীষ হায়দার চৌধুরী : যেটা আমরা পারবো না তেমন কোনো আশা আমরা দেবো না । আমরা যেহেতু বলেছি তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারভিত্তিতে ফ্রিল্যান্সারদের পেশাকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দেয়া হবে। এটা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই হবে।
সূত্র : টেকশহর
