কুমার বিশ্বজিত রায় : কল ড্রপ, দুর্বল নেটওয়ার্ক এবং ভয়েস ও ডাটা প্যাকেজের মূল্য নিয়ে গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ নিরসনে মোবাইল অপারেটরদের আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
তিনি বলেন, ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রাহকদের স্বার্থ ও প্রত্যাশাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সাশ্রয়ী, নিরবচ্ছিন্ন এবং মানসম্মত টেলিযোগাযোগ সেবা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান অগ্রাধিকার।
৩০ জুলাই বৃহস্পতিবার রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে গ্রামীণফোন, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এবং টেলিনরের অংশীদারিত্বে আয়োজিত ‘Digital Inclusion for Marginalized Communities’ কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্যায়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তর অবশ্যই অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে। দেশের নারী, তরুণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীসহ সব প্রান্তিক মানুষ যেন সমানভাবে ডিজিটাল সেবা ও সুযোগ-সুবিধা পায়, সে লক্ষ্যেই কাজ করতে হবে। তাদের ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি, সরকারি সেবায় প্রবেশাধিকার এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকার ও বেসরকারি খাতকে যৌথভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, সরকারের লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করা। সেই লক্ষ্য অর্জনে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা, ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং অর্থবহ ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় টেলিযোগাযোগ সেবার বিস্তার বাড়ানোরও আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী বলেন, ভবিষ্যতে ডিজিটাল বৈষম্যের প্রধান নির্ধারক হবে ইন্টারনেটের মান বা কোয়ালিটি অব সার্ভিস। কেবল নেটওয়ার্ক কভারেজ থাকলেই অর্থবহ কানেক্টিভিটি নিশ্চিত হয় না। এর জন্য প্রয়োজন ডিজিটাল সাক্ষরতা, প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার, উপযুক্ত ডিভাইস এবং সহায়ক ডিজিটাল পরিবেশ।
তিনি জানান, বর্তমানে দেশের ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবারের কাছে মোবাইল সংযোগ থাকলেও এখনও উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী মানসম্মত সংযোগের বাইরে রয়েছে। দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪৪ থেকে ৪৭ শতাংশ নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার করে এবং প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী মোবাইল ব্রডব্যান্ডের ওপর নির্ভরশীল। গ্রাম ও শহরের ইন্টারনেট ব্যবহারে এখনও উল্লেখযোগ্য বৈষম্য রয়েছে।
বিটিআরসি চেয়ারম্যান জানান, মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে অভিন্ন মানদণ্ডে সেবার মান মূল্যায়নের ব্যবস্থা চূড়ান্ত হয়েছে। আগামী তিন মাস পর সারাদেশে মোবাইল নেটওয়ার্কের সেবার মান সম্পর্কিত তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করবে বিটিআরসি। এছাড়া ফোরজি সেবা আরও শক্তিশালী করতে ৭০০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রামের নিলাম সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, স্মার্টফোনের দাম কমাতে এবং ডিভাইসের প্রাপ্যতা বাড়াতে সরকার ইএমআই সুবিধা, সিম-লক প্রযুক্তি এবং মোবাইল ওয়ালেটের মাধ্যমে স্মার্টফোন কেনার সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে ২০২৯ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে ২জি নেটওয়ার্ক বন্ধের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসির আজমান বলেন, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি মানুষের শেখা, আয় করা এবং উন্নত জীবনের সুযোগ সৃষ্টি করে। প্রথম পর্যায়ের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দ্বিতীয় পর্যায়ে জলবায়ু সহনশীলতা, টেকসই জীবিকা এবং তরুণদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বিষয়ক নতুন প্রশিক্ষণ যুক্ত করা হয়েছে, যাতে ডিজিটাল অর্থনীতিতে আরও বেশি মানুষ অংশ নিতে পারে।
গ্রামীণফোন জানায়, কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ে দেশের ৩২টি জেলায় ৩৩ লাখের বেশি মানুষের কাছে ডিজিটাল দক্ষতা ও সেবা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৮ শতাংশ ছিলেন নারী ও কিশোরী। প্রথম পর্যায়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে শিক্ষা, অনলাইন সরকারি সেবা গ্রহণ, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার, ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন এবং ডিজিটাল মাধ্যমে আয়ের সুযোগ তৈরিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে ২০২৮ সালের মধ্যে আটটি সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীসহ মোট ৪০ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ পর্যায়ে সুবিধাভোগীদের ৭০ শতাংশ নারী ও কিশোরী হবে বলে জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে গ্রামীণফোনের হেড অব এনভায়রনমেন্ট, সোশ্যাল অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (ইএসজি) ফারহানা ইসলাম এবং ডিজিটাল ইনক্লুশন লিড তাজরিবা খুরশীদ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
পরে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি নিয়ে একটি প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস, জিএসএমএর সিনিয়র মার্কেট এনগেজমেন্ট ম্যানেজার গগনদীপ মনচান্দা, টেলিনর এশিয়ার চিফ কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার মনীষা ডোগরা, গ্রামীণফোনের চিফ কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ এবং চিফ মার্কেটিং অফিসার ফারহা নাজ জামান।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে গ্রামীণফোনের সিইও ইয়াসির আজমান কর্মসূচির কয়েকজন সুবিধাভোগীর সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তারা জানান, এই উদ্যোগের মাধ্যমে অর্জিত ডিজিটাল দক্ষতা তাদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সরকারি সেবা গ্রহণ এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
