কুমার বিশ্বজিত রায়: মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশ ১৫ বছর পূর্ণ করেছে। এই সময়ে প্রায় ৮ কোটি ৪০ লাখ নিবন্ধিত গ্রাহক নিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় ডিজিটাল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে তারা। বর্তমানে প্রতি সেকেন্ডে গড়ে ২৭৭টি লেনদেন এবং প্রতি মিনিটে ২ কোটি টাকারও বেশি অর্থ লেনদেন হচ্ছে বিকাশের মাধ্যমে। ২০২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা হয়েছে ৬৬১ কোটি টাকা। আর্থিক প্রযুক্তি খাতে এটি বাংলাদেশের অন্যতম বড় সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিকাশের গ্রাহকসংখ্যা দেশের যেকোনো একক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অনেক বেশি। দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংকের গ্রাহকসংখ্যা যেখানে ৩ কোটির কিছু বেশি, সেখানে বিকাশের নিবন্ধিত গ্রাহক প্রায় ৮ কোটি ৪০ লাখ। এমনকি ২০২৬ সালের জুন শেষে গ্রামীণফোনের গ্রাহকসংখ্যা ছিল ৮ কোটি ৬৩ লাখ হলেও, মোবাইল অপারেটরের ক্ষেত্রে একজন গ্রাহকের একাধিক সিম থাকতে পারে। অন্যদিকে, বিকাশে একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে একটি মাত্র হিসাব খোলার সুযোগ থাকায় এর গ্রাহকসংখ্যা সম্পূর্ণ ইউনিক হিসেবে গণ্য করা হয়।
একটি স্মার্টফোন কিংবা সাধারণ বাটন ফোন থাকলেই বিনা খরচে বিকাশ অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। ফলে শহর ও গ্রামের মানুষ, ধনী-গরিব, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নির্বিশেষে সবাই সহজেই এই সেবার আওতায় আসতে পারছেন। বর্তমানে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
২০১১ সালে যাত্রা শুরুর সময় মোবাইল ফোনে টাকা পাঠানোর ধারণা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য ছিল। তখন ব্যাংকের বাইরে অর্থ পাঠানোর প্রধান মাধ্যম ছিল কুরিয়ার বা ডাক বিভাগ, যেখানে টাকা পৌঁছাতে কয়েক দিন সময় লাগত। বিভিন্ন বিল পরিশোধ কিংবা ব্যাংকে টাকা জমা দিতেও দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে দিয়েছে বিকাশ।
বর্তমানে বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে ২০০টিরও বেশি সেবা পাওয়া যাচ্ছে। শুধু অর্থ লেনদেন নয়, অ্যাপ থেকেই নির্দিষ্ট গ্রাহকেরা তাৎক্ষণিক ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণ করতে পারছেন। এই সেবা চালুর পর এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৫ লাখ গ্রাহক প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন। প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক লাখ মানুষ এই ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন। পাশাপাশি বিকাশের মাধ্যমে ডিপিএস ও সঞ্চয় হিসাবও পরিচালনা করা যাচ্ছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান বলেন, একজন রিকশাচালক সারাদিন কাজ শেষে সহজেই পরিবারের কাছে টাকা পাঠাতে পারছেন। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সহজ হয়েছে এবং নগদ অর্থের বিকল্প হিসেবে বিকাশ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। তাঁর মতে, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন।
তিনি আরও বলেন, বিকাশ আন্তর্জাতিক মানের একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এর মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ যেমন এসেছে, তেমনি দেশের মানুষও নানা সুবিধা পাচ্ছেন। ভবিষ্যতে বিকাশের মাধ্যমে আরও জনকল্যাণমূলক সেবা চালু হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বিকাশের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কামাল কাদীর বলেন, দেশের যেকোনো প্রান্তের মানুষ এখন প্রয়োজনীয় ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন বিকাশের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে পারছেন। তাঁর ভাষ্য, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে বিপুল জনগোষ্ঠীকে স্বাধীনভাবে আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ করে দেওয়াই বিকাশের অন্যতম বড় অর্জন।
তিনি আরও বলেন, নগদবিহীন বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি শক্তিশালী ডিজিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে কাজ করছে বিকাশ। এর ফলে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে এটি একটি নির্ভরযোগ্য লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালের ২১ জুলাই ব্র্যাক ব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানি ইন মোশনের যৌথ উদ্যোগে বিকাশের যাত্রা শুরু হয়। শুরুতে মাত্র ৩৭ জন কর্মী এবং তিনটি সেবা ছিল, ক্যাশ-ইন, ক্যাশ-আউট ও সেন্ড মানি। বর্তমানে কর্মীসংখ্যা ৩ হাজার ছাড়িয়েছে এবং নিবন্ধিত গ্রাহক প্রায় ৮ কোটি ৪০ লাখ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের সমান। শুরুর কয়েক বছর লোকসানে চললেও এখন এটি দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মুনাফার দিক থেকে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের একটি।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বিকাশের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো ব্যাংকিং সেবাকে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে পৌঁছে দেওয়া। দেশের প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার এজেন্ট কার্যত ‘হিউম্যান এটিএম’ হিসেবে কাজ করছেন। এর মাধ্যমে প্রবাসী আয় এবং শহরের অর্থ দ্রুত গ্রামে পৌঁছানোয় গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বর্তমানে তৈরি পোশাক শিল্পের প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীরা বিকাশের মাধ্যমে বেতন পাচ্ছেন। এদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ নারী। এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিভিন্ন সরকারি ভাতাও বিকাশের মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে। প্রায় ৭০ লাখ গ্রাহক বিকাশ ব্যবহার করে ডিপিএস ও সঞ্চয় হিসাব খুলেছেন।
দেশীয় জনবলনির্ভর প্রতিষ্ঠান হলেও বিকাশে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ রয়েছে। এর শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে রয়েছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের আইএফসি, যুক্তরাষ্ট্রের গেটস ফাউন্ডেশন, আলিবাবা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান অ্যান্ট ইন্টারন্যাশনাল এবং জাপানের সফটব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, গত ১৫ বছরে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস খাতে বিকাশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে তাঁর মতে, বিকাশ যতটা এগিয়েছে, পুরো খাত ততটা এগোতে পারেনি। তিনি বলেন, বিকাশের মতো আরও চার-পাঁচটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে দেশের ডিজিটাল আর্থিক খাত আরও প্রতিযোগিতামূলক ও কার্যকর হতে পারত। তাঁর মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সীমাবদ্ধতা এবং যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে তা সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও বলেন, বিকাশের বড় সাফল্যের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। বর্তমানে লেনদেনের বড় অংশই এজেন্টনির্ভর ক্যাশ-ইন ও ক্যাশ-আউটের মাধ্যমে হচ্ছে। ভবিষ্যতে মার্চেন্ট পেমেন্টভিত্তিক লেনদেন বাড়াতে পারলে নগদ অর্থের ব্যবহার আরও কমবে এবং ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসার ত্বরান্বিত হবে।
