নিজস্ব প্রতিবেদক : নরওয়েভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ম্নেমোনিক-এর নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে, স্যামসাং স্মার্ট টিভির বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় অ্যাপে এমন কোড রয়েছে, যা ব্যবহারকারীর অজান্তেই তার ইন্টারনেট সংযোগ অন্যদের ব্যবহারের সুযোগ করে দিতে পারে। এর ফলে বিশ্বের লাখো স্যামসাং স্মার্ট টিভি অপব্যবহারের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, এসব অ্যাপের কিছু নির্মাতা দাবি করেছেন, তাদের অ্যাপ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শত শত মিলিয়ন স্মার্ট টিভিতে ইনস্টল করা রয়েছে।
এমন একটি অ্যাপ ছিল সাধারণ একটি প্যাক-ম্যান গেম, যেটিকে স্যামসাং নিজেই অনুমোদন দিয়েছিল এবং স্মার্ট টিভির “এডিটরস চয়েস” বিভাগে স্থান দিয়েছিল।
গবেষকদের মতে, এসব অ্যাপে এমন সফটওয়্যার রয়েছে, যা ব্যবহারকারীর বাড়ি বা অফিসের ইন্টারনেট সংযোগকে তথাকথিত আবাসিক প্রক্সি নেটওয়ার্কে (Residential Proxy Network) যুক্ত করে। এতে বাইরের কেউ ওই সংযোগ ব্যবহার করে নিজের ইন্টারনেট ট্রাফিক চালাতে পারে। অ্যাপটি একবার চালু হলে, পরে সেটি বন্ধ থাকলেও টিভি অন্যের তথ্য আদান-প্রদানের একটি বহির্গমন কেন্দ্র (Exit Node) হিসেবে কাজ করতে পারে।
ম্নেমোনিকের গবেষণায় বলা হয়েছে, স্যামসাংয়ের অ্যাপ স্টোরে নিম্নমানের অনেক অ্যাপ সহজেই অনুমোদন পেয়ে যাচ্ছে। এসব অ্যাপের অনেকগুলোই খুব অল্প কিছু কোড দিয়ে তৈরি, যেগুলোর মূল কাজ অন্য একটি ওয়েবসাইট থেকে গেম বা অন্যান্য বিষয়বস্তু দেখানো। ফলে অ্যাপ পর্যালোচনার সময় পরীক্ষকেরা কেবল ওই অল্প কোডই দেখতে পান, কিন্তু পরে দূরবর্তী সার্ভার থেকে কী ধরনের বিষয়বস্তু বা কোড চালু হচ্ছে, তা সব সময় বোঝা যায় না।
ম্নেমোনিকের আক্রমণাত্মক নিরাপত্তা পরামর্শক হ্যারিসন স্যান্ড বলেন, “যা পর্যালোচনা করা হয়েছে, বাস্তবে সব সময় সেটিই চলবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।”
প্রতিবেদন প্রকাশের আগে টেকক্রাঞ্চ স্যামসাংয়ের কাছে মন্তব্য চাইলে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ব্যবহারকারীর ইন্টারনেট সংযোগ ভাগাভাগি করে এমন অ্যাপ নিষিদ্ধ করা হচ্ছে এবং এ ধরনের বৈশিষ্ট্য থাকা অ্যাপগুলো অ্যাপ স্টোর থেকে সরিয়ে ফেলা হবে।
স্যামসাংয়ের এক মুখপাত্র বলেন, স্মার্ট টিভি প্ল্যাটফর্মে এমন প্রক্সি সুবিধাসংবলিত নতুন অ্যাপ নিবন্ধন ইতোমধ্যে বন্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি আবাসিক প্রক্সি সফটওয়্যার উন্নয়ন কিট (এসডিকে) ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর নীতিমালা কার্যকর করা হচ্ছে এবং বর্তমানে অ্যাপ স্টোরে থাকা এ ধরনের সব অ্যাপ শনাক্ত করে অপসারণের কাজ চলছে।
গত মাসে এলজিও একই ধরনের ঘোষণা দেয়। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তাদের অ্যাপ স্টোরে থাকা প্রায় ৪২ শতাংশ অ্যাপে আবাসিক প্রক্সি সফটওয়্যার ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়ার পর সেগুলো নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কী এই আবাসিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক?
আবাসিক প্রক্সি সফটওয়্যার শুধু স্মার্ট টিভিতেই নয়, স্মার্টফোনের বিভিন্ন অ্যাপ, ডিজিটাল ছবি প্রদর্শনের ফ্রেম এবং অ্যান্ড্রয়েডভিত্তিক স্ট্রিমিং ডিভাইসেও থাকতে পারে। এসব সফটওয়্যার ব্যবহারকারীর ইন্টারনেট সংযোগ অন্যের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়।
প্রতিবার এমন কোনো ডিভাইস ইন্টারনেটে সংযুক্ত হলে, অন্য ব্যক্তি অর্থের বিনিময়ে সেই সংযোগ ব্যবহার করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবাসিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক নিজে অবৈধ নয়। অনেক ক্ষেত্রে ইন্টারনেট সেন্সরশিপ এড়াতে বা বিভিন্ন এলাকা থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য এটি ব্যবহৃত হয়। উদাহরণ হিসেবে, বিভিন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানি তাদের মডেল প্রশিক্ষণের জন্য একসঙ্গে বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহে এ ধরনের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে।
তবে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে হ্যাকার ও গোয়েন্দা সংস্থাও নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে সাইবার হামলা বা তথ্য চুরির মতো অপরাধ চালাতে পারে। কারণ, এসব ট্রাফিক দেখতে সাধারণ কোনো বাড়ির ইন্টারনেট সংযোগের মতোই মনে হয়।
এ ছাড়া এই নেটওয়ার্ক দিয়ে আদান-প্রদান হওয়া তথ্য সাধারণত সাংকেতিকভাবে সুরক্ষিত থাকে, ফলে সেগুলো বিশ্লেষণ বা পর্যবেক্ষণ করাও অত্যন্ত কঠিন।
গবেষণায় যা পাওয়া গেছে
গবেষক হ্যারিসন স্যান্ড স্যামসাং স্মার্ট টিভির সফটওয়্যারে বিশেষ পদ্ধতিতে প্রবেশ করে টিভির অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম এবং সব ধরনের নেটওয়ার্ক তথ্য বিশ্লেষণ করেন। এতে তিনি দেখতে পান, কোন কোন অ্যাপ টিভির ইন্টারনেট সংযোগ অন্যের কাছে পাঠাচ্ছে।
তিনি দেখতে পান, প্যাক-ম্যান গেমটিতে ব্রাইট ডেটা নামের একটি প্রতিষ্ঠানের আবাসিক প্রক্সি সফটওয়্যার রয়েছে। ইসরায়েলভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠান বিশ্বের লাখো আবাসিক ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করে প্রক্সি সেবা দিয়ে থাকে এবং বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করা তথ্যের একটি বাজারও পরিচালনা করে।
তবে স্যান্ড জানান, গেমটি চালু করলেই টিভি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রক্সি নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে যায় না। ব্যবহারকারী সম্মতির পর্দায় অনুমতি দিলে তবেই প্রক্সি সফটওয়্যার সক্রিয় হয় এবং অ্যাপটি মুছে না ফেলা পর্যন্ত পেছনে কাজ করতে থাকে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ওয়েব সার্ভারের কোডে সামান্য পরিবর্তন এনে চাইলে একসঙ্গে শত শত মিলিয়ন স্মার্ট টিভিকে একটি ক্ষতিকর বটনেটের অংশে পরিণত করা সম্ভব হতে পারে।
স্যান্ডের বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, তার টিভির মাধ্যমে যাওয়া তথ্যের বড় একটি অংশ লিংকডইন প্রোফাইল সংগ্রহ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রশিক্ষণের জন্য তথ্য আহরণে ব্যবহৃত হচ্ছিল। তবে তিনি বলেন, তিনি ব্রাইট ডেটার পুরো নেটওয়ার্ক নয়, এর অল্প অংশই পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছেন।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও ব্রাইট ডেটা কোনো জবাব দেয়নি।
