ডিজিটাল বার্তা : যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান হরাইজন৩ ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের নতুন বিনিয়োগ পেয়েছে। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়ন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০০ কোটি (২ বিলিয়ন) ডলারে। মাত্র ১৪ মাসের ব্যবধানে কোম্পানিটির মূল্যায়ন তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে। এ বিনিয়োগ পর্বে আগের বিনিয়োগকারী নাইটড্রাগন ও এনইএ আবারও অংশ নিয়েছে।
এমন এক সময়ে এই বিনিয়োগ এসেছে, যখন গত সপ্তাহে দুটি বড় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাগার জানিয়েছে, তাদের কিছু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়ে বিভিন্ন কম্পিউটার ব্যবস্থায় প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে। এ ঘটনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত ছয় বছর ধরে হরাইজন৩ এমন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি তৈরি করেছে, যা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নিয়ে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কম্পিউটার নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত করতে অনুপ্রবেশভিত্তিক নিরাপত্তা পরীক্ষা (পেনেট্রেশন টেস্টিং) পরিচালনা করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর সাইবার হামলা দ্রুত বাড়তে থাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এখন নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়মিত ও বৃহৎ পরিসরে যাচাই করতে চাইছে। প্রচলিত নিরাপত্তা সেবাদাতারা এই চাহিদা পুরোপুরি পূরণ করতে পারছে না।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ম্যাট হার্টলি বলেন, তাদের নোডজিরো প্ল্যাটফর্মের দুটি প্রধান শক্তি রয়েছে। এটি চলমান কম্পিউটার ব্যবস্থায় পরীক্ষা চালাতে পারে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ করতে হয় না। পাশাপাশি বছরে একবার সীমিত অংশ পরীক্ষা করার পরিবর্তে এটি পুরো অবকাঠামো ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণ করে। শুধু ২ থেকে ৩ শতাংশ নয়, পুরো নেটওয়ার্কই পরীক্ষা করে।
হার্টলি জানান, গত বছর প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক পুনরাবৃত্ত আয় (এআরআর) প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায় এবং আগের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ছিল ১২০ শতাংশ। চলতি বছরে এ প্রবৃদ্ধি আরও বাড়বে বলে তাদের প্রত্যাশা।
তার ভাষ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভিন্ন সরঞ্জামের কারণে সাইবার অপরাধীদের জন্য নতুন ধরনের আক্রমণের কৌশল দ্রুত তৈরি করা সহজ হয়ে গেছে। ফলে নিরাপত্তা দলগুলোকে আগের চেয়ে দ্রুত হুমকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটি পূর্বানুমানযোগ্য ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে গবেষণা ও উন্নয়নে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে।
হার্টলি বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর অনেক প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে আরও সতর্ক হয়ে উঠেছে। অনেকেই এখন জানতে চাইছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শনাক্ত করা সম্ভব কি না। তার মতে, যেসব প্রতিষ্ঠান দ্রুত এআই ব্যবহার শুরু করেছিল, তারা এখন সেই সিদ্ধান্তের নিরাপত্তাগত প্রভাব নতুন করে মূল্যায়ন করছে। বাস্তব বিশ্বের আক্রমণ পদ্ধতির বিরুদ্ধে নিজেদের প্রতিরক্ষা কতটা কার্যকর, তা জানতে নিয়মিত, ধারাবাহিক ও নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা পরীক্ষা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এক বিবৃতিতে হরাইজন৩ জানিয়েছে, তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখন পর্যন্ত ৩ লাখ ১০ হাজার বাস্তব উৎপাদন পরিবেশে নিরাপত্তা পরীক্ষা পরিচালনা করা হয়েছে এবং এতে কোনো ধরনের কার্যক্রম ব্যাহত হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি তাদের সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় অনুপ্রবেশভিত্তিক নিরাপত্তা পরীক্ষার প্রযুক্তিকে “এআই হ্যাকারস” নামে অভিহিত করেছে।
হার্টলির মতে, তাদের প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য কোনো সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান নয়, বরং প্রচলিত নিরাপত্তা মূল্যায়ন ব্যবস্থা। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান বছরে একবার মানব বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে অনুপ্রবেশভিত্তিক নিরাপত্তা পরীক্ষা করায়। তবে এখন গ্রাহকদের চাহিদা বদলেছে। তারা বছরে একবার অবকাঠামোর মাত্র ৫ শতাংশ পরীক্ষা নয়, বরং প্রতি মাসে বা প্রতি সপ্তাহে পুরো অবকাঠামো পরীক্ষা করে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি পর্যবেক্ষণ করতে চায়।
হরাইজন৩-এর প্রতিষ্ঠাতা স্নেহাল আনতানি ও অ্যান্থনি পিলিতিয়েরে যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট স্পেশাল অপারেশনস কমান্ড (জেএসওসি)-এ কর্মরত অবস্থায় পরিচিত হন। সেখানে তারা দেখেন, জনবল ও সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে ধারাবাহিক নিরাপত্তা পরীক্ষা চালানো কঠিন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই পুনরাবৃত্ত নিরাপত্তা মূল্যায়ন স্বয়ংক্রিয় করার লক্ষ্য নিয়ে তারা প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন।
নতুন বিনিয়োগের অর্থ দিয়ে হরাইজন৩ আন্তর্জাতিক কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করবে। এর অংশ হিসেবে ২০২৬ সালের জুনে নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে নতুন কার্যালয় চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরেও কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অংশীদার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং গবেষণা ও উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে ইডিবিআই (সিঙ্গাপুর), প্রতিরক্ষা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এসএআইসি এবং চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কোয়ালকম। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, তারা যে নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান করছে, তা কোনো একটি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
হরাইজন৩-এর গ্রাহকসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার ২০০ থেকে ৭ হাজার ৩০০। এর মধ্যে ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সেবা দেওয়া ম্যানেজড সার্ভিস প্রোভাইডার (এমএসপি) থেকে শুরু করে বিশ্বের শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের (ফরচুন ১০) অন্তর্ভুক্ত বড় বড় কোম্পানিও রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের সম্ভাব্য বাজারের আকার কয়েক দশ বিলিয়ন ডলার। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চ-এর তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক সাইবার নিরাপত্তা বাজারের আকার ২০২৫ সালে ছিল ২৭১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। ২০৩৩ সালের মধ্যে তা বেড়ে ৬৬৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। তথ্য সূত্র : টেকক্র্যাঞ্চ।
